• LOGIN
  • No products in the cart.

Login

মৌসুমী বায়ু

লেখক: শান্তনু কুন্ডু

M.A., B.Ed. (Geography)

★মৌসুমি বায়ু কি?

‘মৌসুমি’ শব্দটি এসেছে মূলত আরবি শব্দ ‘মৌসিম’ এবং মালয় শব্দ ‘মনসিন’ থেকে,যার অর্থ হল ‘ঋতু’। এটি একটি ঋতুভিত্তিক বায়ুপ্রবাহ, অর্থাৎ গ্রীষ্ম ও শীত ঋতুতে পরস্পর বিপরীত দিক থেকে এই বায়ুর প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। বছরের প্রথমার্ধে দঃ-পঃ দিক থেকে এবং দ্বিতীয়ার্ধে উঃ-পূঃ দিক থেকে এর প্রবাহ হয়ে থাকে।

এটি মহাদেশ ও সংলগ্ন মহাসাগরের তাপমাত্রার তারতম্যজনিত কারণে সৃষ্টি হয়,যা ভারত তথা সমগ্র দঃ-পূঃ এশিয়ায় বিপুল বৃষ্টিপাত ঘটায়। সূর্য স্থলভাগ ও জলভাগকে কিছুটা ভিন্নভাবে উত্তপ্ত করে।গ্রীষ্মকালে,মহাসাগরের তুলনায় মহাদেশ তুলনামূলকভাবে অধিক উত্তপ্ত হয়,ফলে উত্তপ্ত বায়ু উপরে ওঠে এবং নিম্নচাপের সৃষ্টি করে। অপরদিকে,ভারত মহাসাগরের ওপর উষ্ণতা কিছুটা কম হওয়ায় এখানে উচ্চচাপ বলয়ের উদ্ভব ঘটে।

বায়ু সাধারণত উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে থেকে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবাহজনিত কারণে, জুন মাসের মধ্যে জলীয়বাষ্প সম্পন্ন বায়ু দঃ-পঃ থেকে উঃ-পূঃ দিকে জলভাগ থেকে স্থলভাগের ওপর দিয়ে ছুটে আসে। দঃ-পঃ থেকে উঃ-পূঃ এ বাঁকের কারণ হিসাবে হিমালয় পর্বতের বিশাল উচ্চতার কথা বলা হয়, যা এই বায়ু অতিক্রম করতে পারে না, ফলে পর্বতের গা বরাবর ওপরে উঠে আসে এবং তাপমাত্রা হারিয়ে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

★প্রধান দুটি মৌসুমি ঋতু কি কি?

ভারতবর্ষ তার বৃষ্টিপাতের ৭৫ শতাংশই দঃ-পঃ মৌসুমি বায়ু (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) ও বাকীটা উঃ-পূঃ মৌসুমি বায়ু (Retreating monsoon) (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) থেকে পেয়ে থাকে।

★দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু

যখন এই বায়ু ভারতে পৌঁছায়,তখন তা পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় প্রতিহত হয়ে প্রধানত দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি শাখা আরবসাগর ও পশ্চিম উপকূলের ওপর দিয়ে উত্তরে প্রবাহিত হয়, যা আরব সাগরীয় শাখা নামে পরিচিত। অপর শাখা বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে আসামে পৌঁছায় এবং পূর্ব হিমালয়ে প্রতিহত হয়, যা ‘বঙ্গোপসাগরীয় শাখা’ নামে পরিচিত।

★আরব সাগরীয় শাখা

মৌসুমি বায়ুর আরবীয় শাখা সরাসরি পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় প্রতিহত হয়ে উপকূল থেকে ১-২ কিমি. উপরে উঠে পড়ে জলীয় বাষ্পপূর্ণ এই বাতাস যতই উপরে ওঠে ততই চাপ হ্রাসে প্রসারিত ও শীতল হয়ে পর্বতগাত্রে প্রচুর বৃষ্টিদান করে আরবসাগর হতে আগত বায়ুর কিয়দংশ নর্মদা ও তাপ্তী উপত্যকার মধ্য দিয়ে গিয়ে বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতমালায় প্রতিহত হয়ে ঐ অঞ্চলে মাঝারি বৃষ্টিপাত ঘটায়। আরবসাগর হতে প্রবাহিত বায়ুর অন্য একটি শাখা কচ্ছ,কাথিয়াবাড় ও পশ্চিম রাজস্থানের মরু অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় উচ্চ পর্বতের অভাবে ও অত্যধিক উত্তাপজনিত কারণে খুব সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটায়। সেই জন্য রাজস্থানে থর মরুভূমি-র সৃষ্টি হয়েছে। পরে এই বাতাস আরও উঃ ও উঃ-পূঃ এ প্রবাহিত হয়ে, পশ্চিমে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ুর বঙ্গোপসাগরীয় শাখার সহিত মিলিত হয়ে পূর্ব পাঞ্জাব, পূর্ব রাজস্থান ও পশ্চিম হিমালয়ে হাল্কা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে থাকে।

★বঙ্গোপসাগরীয় শাখা

এই শাখা বঙ্গোপসাগর থেকে সোজা পূর্বদিকে মায়ানমারের আরাকান উপকূলে প্রতিহত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিদান করে।পরে এই বাতাস পঃ ও উঃ-পঃ এ প্রবাহিত হয়ে নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ করে। বঙ্গোপসাগরীয় মৌসুমি বায়ুর অন্য একটি শাখা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে অসমের খাসিয়া পাহাড়ে ও পূর্ব হিমালয়ে প্রতিহত হয়ে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায় সেইজন্য খাসিয়া পাহাড়ের চেরাপুঞ্জির নিকট মৌসিনরামে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত (১২৫০ সেমি.) হয়। কিন্তু চেরাপুঞ্জির বিপরীত দিকে শিলং শহরে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলজনিত কারণে,এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ২০০ সেমি.। বঙ্গোপসাগরীয় মৌসুমির এই শাখা অত্যুচ্চ হিমালয় অতিক্রম করতে না পেরে হিমালয়ে প্রতিহত হয়ে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। একটি অংশ পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় প্রচুর বৃষ্টিদান করে।অপর অংশটি পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উওরপ্রদেশ ও হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে বৃষ্টিদান করতে করতে ক্রমশ পশ্চিমে অগ্রসর হয়।এই বায়ু যতই পশ্চিমে অগ্রসর হয়,এতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ততই কমতে থাকে,ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমতে থাকে।

★উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু (Retreating Monsoon)

মৌসুমি বায়ুর আরবসাগরীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় শাখা দুটি অক্টোবর মাস থেকে প্রত্যাগমন করতে থাকে।এই সময় সূর্য নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে ক্রমশ দক্ষিণে অগ্রসর হয়।ফলে, পাঞ্জাব অঞ্চলের বাতাস ক্রমশ শীতল হয়ে ধীরে ধীরে উচ্চচাপের সৃষ্টি করে। পাঞ্জাবের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নির্গত বায়ু,দঃ-পঃ মৌসুমি বায়ুকে ক্রমশ পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য করে,তাই একে প্রত্যাগমনকারী মৌসুমি বায়ুও বলা হয়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দঃ-পঃ মৌসুমি বায়ু ভারতীয় উপমহাদেশ হতে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত হয়। পাঞ্জাবের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নির্গত বায়ুর সহিত দঃ-পঃ মৌসুমি বায়ুর সংঘর্ঘে যে ঘূর্ণবাতের সৃষ্টি হয়,তাকে আমরা ‘আশ্বিনের ঝড়’ বলে থাকি। এই ঘূর্ণবাত ভারতের পূর্ব উপকূল বরাবর আসে,ফলে তামিলনাড়ুর নিকট প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এই কারণে তামিলনাড়ুর উপকূলে বছরে দু’বার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে

★বৃষ্টিপাত পরিমাপের ক্ষেত্রে কোন কোন্ যন্ত্রাদি ব্যবহার করা হয়?

‘রেনগজ’ নামক এক বেলনাকার যন্ত্র এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রধানত গাছ-গাছালি ও শহরতলী থেকে কিছুটা দূরে ফাঁকা স্থানে খোলা আকাশের নিচে রাখা হয়। এর মধ্যে থাকা সিলিণ্ডারের ভিতরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে জমা হয় যা মিলিমিটার স্কেলে পরিমাপ করা হয়ে থাকে। তবে,কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ও ওয়েদার র‍্যাডারেরও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

★ভারতের মৌসুমি বায়ুর নির্ণায়ক দিকগুলি ঠিক কি কি?

ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD) এর মতামত অনুযায়ী এর মূল পাঁচটি নির্ণায়ক দিক হল-

১) উঃ প্রশান্ত ও উঃ আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণতার তারতম্য।

২) নিরক্ষীয় ভারত মহাসাগরের সমুদ্রতলদেশের উষ্ণতা।

৩) পূঃ- এশিয়ার নিকট প্রশান্তমহাসাগরীয় সমুদ্রতলদেশের প্রমাণ চাপ।

৪) উঃ-পঃ ইউরোপের ভূ-পৃষ্ঠের উপরিতলের উষ্ণতা।

৫) নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণস্রোত।

★ভারতে মৌসুমি বায়ু গুরুত্বপূর্ণ কেন?

ভারত কৃষিপ্রধান দেশ,এখানে ৭০ শতাংশ অধিবাসী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর, কিন্তু কৃষিজমির ৪০ শতাংশ আজও কোনোপ্রকার জলসেচের আওতায় না আসায় ভারতীয় কৃষির বেশীরভাগটাই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং, ভারতে মৌসুমিবায়ু ঘরোয়া উপার্জন থেকে শুরু করে জীবিকা প্রতিক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।

★মৌসুমিবায়ুর পরিমাণ কিভাবে বোঝা যায়?

ভারতবর্ষের গড় বৃষ্টিপাত ১১৬ সেমি.,যার প্রায় ৮৯ সেমি. জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হয়ে থাকে। এই নম্বরটিকে ‘দীর্ঘ সময়ের গড়’ বা LPA (Long Period Average) বলা হয়ে থাকে।এটি ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর (IMD) ১৯৫১ থেকে ২০০১ অবধি দীর্ঘ ৫০ বছরের জলবায়ুর গড় অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করে বিবেচনা করেছে। IMD এর মতানুযায়ী, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ LPA এর ৯৬%-১০৪% হলে সেটি মৌসুমির স্বাভাবিক অবস্থা; ১০৪%-১১০% হলে- স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী; ১১০% এর চেয়ে বেশী হলে- অত্যধিক ;৯০% থেকে ৯৬% হলে-স্বাভাবিকের চেয়ে কম এবং এর চেয়ে কম হলে মৌসুমি বায়ুর অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে থাকে।

July 13, 2018

48 responses on "মৌসুমী বায়ু"

  1. Khub valo…. carry on

  2. Extraordinary…?☺

  3. ভালো হয়েছে ….সৌরমন্ডল নিয়ে পুরো একটা লেখা দিও পারলে

  4. শ্রীকান্ত মণ্ডলJuly 12, 2018 at 11:08 pm

    সুন্দর হয়েছে খুব সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব এটা , এরকম লেখা আরও চাই …

  5. খুব ভালো হয়েছে। আরো কিছু পোস্ট কোরো, ভূগোল টা কিছু জিনিস মনে রাখতে খুব সমস‍্যা হয়।

  6. Khub valo hye6e re ….Carry on

  7. ki comment krbo…..ja bolbo sob e choto lagbe… mother of science

  8. Khub valo vai..
    Carry on

  9. খুব ভাল লাগল ? পরবর্তীতে আরো কিছু আশা করছি ☺☺☺☺☺

  10. Valuable??

  11. দারুন হয়েছে স্যার এক কথাই অসাধারন

  12. তন্ময় মন্ডলJuly 13, 2018 at 6:58 am

    খুব ভাল…ভাই, চালিয়ে যা পাশে আছি…??

  13. বিগত কিছু বছরে মৌসুমী বায়ুর গতিপ্রকৃতির যে পরিবর্তন হয়েছে সেইদিকটা উত্থাপন করলে ভালোহতো, বাকিসব একদম ঠিকঠাক। খুবভালো।

  14. Darun….stti vlo?

  15. Darun lekha ….aro eirokom lekha asuk

  16. Khub valo …. Onnek gulo jinis Jana galo ….

  17. GOOD INITIATIVE.?

  18. GOOD INITIATIVE.?

Leave a Message

Who’s Online

There are no users currently online

X